Swadesh Chitro
  • ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩
banner

নিজ জেলায় ডেপুটেশনে বহাল তবিয়তে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা খাদ্য পরিদর্শক কামাল , উঠছে নানা প্রশ্ন


FavIcon
ময়মনসিংহ,প্রতিবেদক:
প্রকাশিত: অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০১:০৯ পিএম
নিজ জেলায় ডেপুটেশনে বহাল তবিয়তে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা খাদ্য পরিদর্শক কামাল , উঠছে নানা প্রশ্ন
নিজ জেলায় ডেপুটেশনে বহাল তবিয়তে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা খাদ্য পরিদর্শক কামাল , উঠছে নানা প্রশ্ন

৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদের পতনের পরও আজ অবদি বিভিন্ন দপ্তরে তাঁদের দোসররা এখনো রয়েছেন বহালতবিয়তে। বিভিন্ন সময়ে বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের সংবাদ প্রকাশ হলেও গফরগাঁও সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাবেক ভিপি হিসাম ও আরিফের কমিটির সদস্য, কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি সাজুর সময়ে নাট্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে কর্মরত খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল এখনো নিজ জেলায় স্বপদে বহাল আছেন। ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য পরিদর্শক সমিতির অঘোষিত নিয়ন্ত্রক ও ‘সম্রাট’ হিসেবে তাঁর খ্যাতি রয়েছে। তিনি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের সেচ শাখার সেচপাম্প মেরামতকারী শাহ আবুল কাশেমের বড় ছেলে।  এছাড়াও তিনি গফরগাঁও আমরা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংগঠনের উপজেলা শাখার সহ সভাপতি। আওয়ামী লীগ পন্থী এই খাদ্য পরিদর্শক এর  কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সংবাদ বিভিন্ন সময়ে  সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। সম্প্রতি কিছু সুবিধাবাদী ছত্রছায়ায় পূর্বের ন্যায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা সমালোচনা।  সংবাদমাধ্যম ও সংবাদপত্রে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও রহস্যজনক কারণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অতি দ্রুত তাকে প্রত্যাহার ও বদলীর পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে অবৈধ পথে করা আয় ও সম্পত্তি সরকারী ভাবে নিয়ে নেওয়ার দাবী জানিয়েছেন বিভিন্ন মহল।  

খোজ নিয়ে জানা যায়, গফরগাঁওয়ের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের তদবিরে ২০০০ সালের ২৬ ডিসেম্বর খাদ্য বিভাগে চাকরিতে যোগ দেন কামাল।২০০৮ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরাসরি আওয়ামীলীগের মিছিল মিটিং এ অংশ গ্রহণ করেন।  এ ছাড়াও ২০২০ সালে নেতাদের তদবীর করে উপজেলা এলএসডি হিসেবে বদলী নেয়। এরপর থেকেই সরাসরি আওয়ামীলীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের ছবিও তুলেন। পাশাপাশি অফিস ফাকি দিয়ে বিভিন্ন পোগ্রাম গুলোতে নিজে উপস্থিত থেকেছেন। ২০২০ সালের জুলাইয়ে ধান সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগে ময়মনসিংহের ফুলপুর এলএসডি থেকে তাকে প্রত্যাহার করে নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলা খাদ্য দপ্তরে পদায়ন করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পরবর্তীতে তিনি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় বদলি হয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে ডেপুটেশনে যোগ দেন।  এরপর থেকেই বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তার, পরিবহন ঠিকাদার নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে তদবির, অনিয়ম-দুর্নীতি, জুয়ার আসর থেকে অর্থ আদায় করে কামাল ও স্ত্রী নূরজাহান বেগম, ছোট ভাই শাহ ইশতিয়াক রুবেল এবং শ্যালক ফাহিমের নামে বিভিন্ন জায়গায় জমি ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ করেছে । তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির পাহাড় পরিমান অভিযোগে সংবাদ প্রকাশ হলেও তিনি এখনো স্বপদে বহাল আছেন।  ময়মনসিংহ খাদ্য পরিদর্শক সমিতির সহ সভাপতি (ভিপি)  পদে থাকায় ২০২৫ সালে ময়মনসিংহ আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আশরাফুল আলমের নেতৃত্বে গঠিত একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বদলি বাণিজ্যের পুরো প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতা করছেন খাদ্য পরিদর্শক মো. মাজহারুল ইসলাম কামাল। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ‘পারিবারিক সমস্যা’ দেখিয়ে প্রত্যাহারের আবেদন করিয়ে এরপর মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে অন্যদের পদায়ন করেছেন। বর্তমানেও বিভাগের বিভিন্ন ওসিএলএসডি এবং এলএসডিদেরকে বদলীর ভয়ে দেখিয়ে অর্থ আদায় করছেন।  তার কথার বাইরে কেউ গেলে সেই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাংবাদিক লাগিয়ে দিয়ে বিভিন্ন ভয় দেখায়। আলোচিত সকল বিষয়ে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম এ সংবাদ প্রকাশ হলেও নেওয়া হয়নি কোন ব্যবস্থা।   

এদিকে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণের বদলি/পদায়ন নীতিমালা-২০১৯ (সংশোধিত-২০২২)   বাংলাদেশ সচিবালয়ের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংস্থা প্রশাসন-১ শাখার ২০২২ সালের  ১৪ নভেম্বর ১৪ ডিসেম্বর  রাষ্ট্রপতির আদেশ ক্রমে সাবেক সচিব মো: ঈসমাইল হোসেন এনডিসির স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপন সুত্রে জানা যায়,  খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি/পদায়ন নীতিমালা-২০১৯ (সংশোধিত-২০২২)-এ একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের মেয়াদ ও নিজ জেলায় পদায়ন সংক্রান্ত সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংস্থা প্রশাসন-১ শাখার প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, একই কর্মস্থলে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর কার্যকাল দুই বছর হলে সাধারণত তিনি বদলিযোগ্য হবেন এবং একই কর্মস্থলে কোনো কর্মচারীকে তিন বছরের বেশি রাখা যাবে না। পাশাপাশি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বা সমমানের পদসহ নির্দিষ্ট কয়েকটি পদে নিজ জেলায় নিয়োগ বা পদায়নের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে। এছাড়া ১০ম থেকে ১৬তম গ্রেডভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ উপজেলায় নিয়োগ বা বদলি না করার নির্দেশনা রয়েছে। এদিকে তাঁর এই বদলি নীতিমালার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

গফরগাঁও এর বিএনপি সুলতান জানান, ১৯৯৭ সালের ২৯ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গফরগাঁওয়ে বিএনপির জনসমাবেশে যোগ দিতে যাওয়ার পথে গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কামালও ছিলেন।  ও সরাসরি আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। অসাধু উপায়ে বর্তমানেও ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছে৷  তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে।  খাদ্য অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।  পাশাপাশি চাকরির পুর্বে কি ছিলো এবং বর্তমান কি রয়েছে খোজ নিয়ে অবৈধ পথে সম্পদের হিসাব, ব্যাংক ব্যালেন্স, নগদ অর্থের বিষয়ে খোজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।  

ময়মনসিংহ শহরের সবুজ জানান, দীর্ঘদিন বছর ময়মনসিংহে অবস্থানের সুযোগ নিয়ে শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল তার নিজের নামে, বেনামে এবং স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের নামে বিপুল অর্থ-সম্পদ ও বিনিয়োগ করেছেন। ময়মনসিংহ নগরীর মফিজ উদ্দিন ইনডেক্স প্লাজায় ৭সি নম্বরের একটি ফ্ল্যাট, আমলাপাড়ায় মাদ্রাসার পাশের একটি ফ্ল্যাট, দুর্গাবাড়ী রোডে একটি দোকান, কাঁচিঝুলিতে দুই ভাইয়ের নামে ছয়তলা ফাউন্ডেশনের চারতলা ভবন এবং নতুন বাজারের ফারহান কমপ্লেক্সে দুটি ফ্ল্যাট বুকিংয় করেছে । এছাড়া গফরগাঁওয়ের জামতলা মোড়ে একটি দোকান এবং ইমামবাড়ী ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন বাজারে একাধিক দোকান রয়েছে। ঢাকার উত্তরা এলাকায় একটি ফ্ল্যাট এবং ময়মনসিংহের ঢাকা বাইপাস এলাকায় এসএসসি-৯৩ ব্যাচের বন্ধুদের সম্মিলিত উদ্যোগে কেনা জমিতে তার তিনটি শেয়ার রয়েছে।ঢাকা মেট্রো-গ-৪৩-২৬৪৭ নম্বরের একটি টয়োটা প্রিমিও গাড়ি ময়মনসিংহ খাদ্য বিভাগের পরিবহন ঠিকাদার ও সাবেক যুবলীগ নেতা আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে আজাদের নামে নিবন্ধিত হলেও সেটি শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল ব্যবহার করেন। গাড়িটি মফিজ উদ্দিন ইনডেক্স প্লাজার গ্যারেজে রাখা হয় । তবে গাড়িটির প্রকৃত মালিকানা, ব্যবহার ও অর্থের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বিআরটিএর নিবন্ধন তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে অতি দ্রুত কামাল এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।  

ময়মনসিংহ শহরের বাসিন্দা সুলতান অভিযোগ করে বলেন, নগরীর নতুন বাজার কাঁচাবাজারে গেন্দু মিয়ার হোটেলের পাশে ময়মনসিংহ খাদ্য পরিদর্শক সমিতির কার্যালয়ে রাতে জুয়ার আসর বসে। তার দাবি, ওই আসরে একজন ‘বিডার’ হিসেবে অংশ নিয়ে কামাল প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করেন। অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ময়মনসিংহের বিএনপি নেতা শামছুল হক বলেন, মাজহারুল ইসলাম কামাল একসময় কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন বলে আমরা জানি। চাকরিতে যোগদানের আগে তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা কী ছিল এবং বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ কত—এসব বিষয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ময়মনসিংহ বিভাগের কয়েকজন খাদ্য গুদামের খাদ্য পরিদর্শক ও সংরক্ষণ ও চলাচল কর্মকর্তারা জানান, মাজহারুল ইসলাম কামাল ভাই এর কথা না শুনলে আমাদের হুঠ করেই বদলী করে দেওয়া হয়।  এর আগেও দেশের প্রত্যেকটি মিডিয়াতেই তার বদলী বানিজ্য সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। বদলি নীতিমালা সবার জন্য সমভাবে প্রয়োগ করা হলে কামালের নিজ জেলায় বদলি কীভাবে হলো, আর জেলা কার্যালয়ে প্রায় ৬ বছর ডেপুটেশনে কর্মরত কিভাবে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিষয়টি তদন্ত করে নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা। দ্রুত তাকে ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে প্রত্যাহার ও তার বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ এর তদন্ত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবী জানান । 

এদিকে ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য কার্যালয়ের খাদ্য পরিদর্শক মাজহারুল ইসলাম কামালকে ০১৭১৬২৮৯৪৯০ নাম্বারে কল দেওয়া হলে বন্ধ পাওয়ায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।  

অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহমুদুল হাসান এর +880 1718-527255 ও ময়মনসিংহ আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আশরাফুল আলম এর +8801712674028 নাম্বারে অংসখ্যবার কল দেওয়া হলে রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। 

খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) রেজা মোহাম্মদ মহসিন জানান, ময়মনসিংহ আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আশরাফুল আলম এর সাথে কথা বলেন।  তিনি কন্ট্রোলিং অফিসার।  

এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয় এর উপ সচিব (সংস্থা প্রশাসন-১ শাখা) মোঃ মাহাবুর রহমান শেখ জানান, সর্বোচ্চ চার বছরের বেশি থাকার সুযোগ নেই।  এর আগে যদি কোন অভিযোগ উঠে তাহলে এর আগেই বদলী হয়ে যায়।  যদি জেলা কার্যালয়ে ৬ বছর থাকে তাহলে নাম ঠিকানা দেন আমি খোজ খবর নিচ্ছি।  

অন্যদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন-১ অধিশাখা) সনজীদা শরমিন জানান, শুনেছি, ডিজি স্যারকে বলেন।  পাশাপাশি আমিও বলব।  নীতিমালার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেখে বলতে হবে৷  

Banner
Side banner
Side banner