জামালপুর জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অফিসের প্রধান সহকারী জাহাঙ্গীর কবীর বাবুর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর কবির বাবু ওরফে সাদাবাবু ভুয়া বিল বাউচার, কাজ বানিয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আদায়, দুর্নীতি, অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য, নিয়োগ, তদবির ও পার্টনারে ঠিকাদারিসহ নানা অপকর্ম করে বর্তমানে কোটি কোটি টাকার মালিক। বাস করছেন নির্বাহী প্রকৌশলীর জন্য বরাদ্দকৃত বাড়িতে, চাষ করছেন সরকারি পুকুর। কর্মস্থল আর নিয়ন্ত্রণ অফিসে প্রায় একযুগ থাকায় আধিপত্যটাও গড়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্য। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকারি কর্মচারি হয়েও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন বাবু। সব মিলিয়ে হাজারের অঙ্কে বেতন পাওয়া ছাপোষা ড্রাইভারের ছেলে এখন কোটিপতি বনে গেছেন।তার বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে দেশের বিভিন্ন পত্রিকা/অনলাইনে সংবাদ প্রকাশের পর তাকে ওএসডি করা হলেও বর্তমানে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। হোয়াইট বাবুকে নিয়ে জেলাজুড়ে চলছে নানা আলোচনা ও সমালোচনা।সবার একই প্রশ্ন, তার খুঁটির জোর কোথায়? অতি দ্রুত সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তাকে আইনের আওতায় আনার জোর দাবী সচেতন মহলের ব্যক্তিরা।
জানা যায়, জামালপুর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের গাড়ি চালক ছিলেন জাহাঙ্গীর কবির বাবুর বাবা আব্দুল হালিম। কোটার জামানায় বাবার কোটায় ২০১৫ সালে প্রধান সহকারী হিসেবে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাকরিতে যোগদান করেন জাহাঙ্গীর কবীর বাবু। প্রভাবশালী এই অফিস সহকারী জামালপুর শহরের বোসপাড়াস্থ জনস্বাস্থ্য নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসায় বসবাস করে থাকেন। তাই তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা অধিদফতরের কোয়ার্টারেই। ।কুষ্ঠু রোগে আক্রান্ত হয়ে পুরোদেহ সাদা হওয়ায় তাকে অনেকেই চিনেন ‘সাদা বাবু’ নামে। আবার কেউ ডাকেন ‘হোয়াইট বাবু’ বলে। পরিত্যক্ত করে নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবনেই পরিবার নিয়ে বর্তমানেও বসবাস করছেন কথিত ‘ছায়া নির্বাহী প্রকৌশলী’ বাবু।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শেখ হাসিনার আমলে গোপালগঞ্জের পরই বেশি বরাদ্দ হয়েছে জামালপুরে। ওই বরাদ্দের বেশিরভাগ আবার হলো জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদফতরে। হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ আর শতশত কোটি টাকা লোপাট হয়েছে রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানে।
১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০ অর্থ বছরের পাশাপাশি ২০২০-২১ অর্থ বছর থেকে ২৪-২৫ অর্থ বছর পর্যন্ত সমগ্রদেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পে জামালপুর জেলায় সাবমারসিবল পাম্পযুক্ত গভীর নলকূপ ১৫৬০ টি ও অগভীর নলকুপ ৯৬২ টি এবং কমিউনিটি বেউজড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম ৩২৯ টি ৮৩ কোটি ৪৪ লক্ষ ৭৮ হাজার, মুজিব শতবর্ষে ভূমিহীন, গৃহহীনদের জন্য নির্মিত আশ্রয়ন প্রকল্পের পানি সরবরাহ প্রকল্পের কয়েটি উপজেলায় ৬৩৯ টি অগভীর নলকূপে ৩ কোটি ৩৫ লক্ষ ২৪ হাজার জিপিএস উন্নয়ন প্রকল্পের ১০৭ টি ওয়াশ ব্লক নির্মাণে ১৭ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার ও ১৬১ টি পানির উৎস স্থাপনে ২ কোটি ৯৭ লাখ ৯৫ হাজার টাকা,এনএনসিপিএস উন্নয়ন প্রকল্পের ৯২ টি ওয়াশ ব্লক নির্মাণ ১২ কোটি ৬৩ লাখ ৫৪ হাজার ও ১৬১ টি পানির উৎস স্থাপন এ ২ কোটি ৯৭ লক্ষ ৯৫ হাজার,পিইডিপি উনন্নয়ন প্রকল্পের ৪৮৪ টি ওয়াশ ব্লকে ৮৪ কোটি ৭০ লাখ ও ৮০০ টি পানির উৎস স্থাপনে ১৫ কোটি ৬৮ লক্ষ,রাজস্ব বাজেটের আওতায় পাম্পযুক্ত অগভীর নলকূপে ৪৭ হাজার,পানির গুনগত মান পরীক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের ১ টি ল্যাবরেটরী ভবন নির্মাণ কাজে ৫৩ লাখ ৭৮ হাজার,মানব সম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি শীর্ষক প্রকল্পের ১৬ টি হ্যান্ড ওয়াশি ষ্টেশন ও ৩৬ টি স্যানিটেশন হাজিন ফেসিলিটিস এবং ২৮ টি সাবমাসে ১০ কোটি ৩৬ লাখ ৮৪ হাজার, ৯৬টি কমিউনিটি বেইজ ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম ১৬ কোটি ৭১ লাখ ৫৯ হাজার, ৩১ টি মূল পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিমে ৫ কোটি ৫১ লাখ, সরিষাবাড়ী, মাদারগঞ্জ ও মেলান্দহ উপজেলায় ৪টি লার্জ পাইপম ওয়াটার সাপ্লাই স্কিমে ২৪ কোটি ৮৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণ কাজ শেষ করা হয়। এ ছাড়াও ৩২ টি পৌরসভায় পানি সরবরাহ ও মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহ এনভায়রনমেন্টাল স্যানিটেশন প্রকল্পে ২ টি উৎপাদক নলকূপ এটি এক্সপ্লোরেটরী ড্রিলিং পরীক্ষামুলক নলকূপ, ২টি পাম্প হাউজ ও ২ টি সাবমারসিবল পাম্প খননে ৮৫ লাখ, ৩২ কি: মি: পাইপ লাইন স্থাপন কাজে ও ৭৭ লাখ ৯২ হাজার, ১.৫ কি মি আর সিসি ড্রেইন নির্মাণে ১ কোটি ৪ লাখ ৪৮ হাজার, ১টি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং ট্রান্সমিশন পাইপ লাইন স্থাপন কাজে ৫ কোটি ৯১ লাখ ১৪ হাজার, ১ টি ফিক্যাল স্নাজ এবং সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট নির্মাণ কাজে ৭ কোটি চার লাখ ৮৫ হাজার, ৪ টি পাবলিক টয়লেট ও ১২ টি কমিউনিটি টয়লেট এবং ২৫ টি কমিউনিটি বিন স্থাপনে ৫৮ লাখ ৯৩ হাজার টাকা ব্যায়ে উন্নয়ন কাজ করা হয়। এদিকে জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পে ৪ টি পরীক্ষা মুলক নলকূপ স্থাপনে ৩ লাখ ৮ হাজার, ২ টি উৎপাদক নলকূপ ও৪ টি পরীক্ষামূলক নলকূপ এবং ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল সহ পাম্প হাউজ নির্মাণে ১ কোটি ৩৪ লাখ, ৩০০০ ঘনমিটার ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন ভূ-গর্ভস্থ জলাধার নির্মাণে ৫ কোটি ৬৫ লাখ ৫ হাজার, ৮ টি পরীক্ষামুলক নলকূপ, ৪ টি উৎপাদক নলকূপ, ৪ টি পাম্প হাউজ, ৪ টি বাউন্ডারী ওয়াল, ৪ টি সাবমারসিবল পাম্প সহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি কাজে ২ কোটি ৫৫ লাখ ৪৮ হাজার, ২.৪ কিমি ট্রান্সমিশন পাইপ লাইন স্থাপনে ১ কোটি ৩২ লাখ ৫ হাজার, ৬,২ কিমি সারফেস ড্রেন নির্মাণ কাজে ১০ কোটি ৯০ লাখ ১৮ হাজার, ১ টি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ কাজে ২১ কোটি ২৮ লাখ ৫২ হাজার, ৪০০ মি সারফেয ড্রেন ওয়ালকওয়ে নির্মাণে ১ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজ চলমান রয়েছে। অন্যদিকে ৩০ টি পৌরসভায় পানি সরবরাহ ও স্যাবিটেশন প্রকল্পে ইসলামপুরে ড্রেন ও নলকূপ স্থাপনে ৯ কোটি ৭৫ লাখ ২৮ হাজার, ৩ টি পরীক্ষা মুলক নলকূপ, উতপাদক নলকূপ এবং ৩ টি পাম্প হাউজ নির্মাণে ৩ কোটি ৪৩ লাখ ৭ হাজার, ইঞ্জিনিয়ার অফিসে ২১ লাখ ৪১ হাজার, ৩ টি পাবলিক টয়লেট, ১ টি ফিক্যাল স্ল্যাজ ট্রিটম্যান্ট প্ল্যান্ট ২ কোটি ২৭ লাখ ২২ হাজার, ৯৮২ টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণে ৬ কোটি ৯০ লাখ ৩৪ হাজার, ইসলামপুর পৌরসভা প্ল্যান্টে ২ কোটি ১০ লাখ ৩১ হাজার টাকার কাজ সমাপ্ত করা হয়েছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশের ১০ টি অগ্রাধিকার ভিত্তিক শহরে সমন্বিত স্যানিটেশন ও হাইজিন প্রকল্পে ৬ টি পানির উৎস ও ১৫০ টি হাউজ হোল্ড কানেকশন এবং ২৪ টি স্ট্রিট হাইড্রেন্ট এ ২৩ লাখ ৭৯ হাজার, ৫ টি কমিউনিটি ল্যাট্রিনের ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার কাজে বাবুর সহযোগিতায় ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে । প্রত্যেকটি কাজে বাবুর মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে আলাদা করে ১ টির জন্য ২/৩ হাজার টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা জানান , নির্বাহী প্রকৌশলীরা অনিয়ম করে যে টাকা কামিয়েছে তার থেকে তিন গুণ টাকা কামিয়েছে জাহাঙ্গীর কবীর বাবু। তিনি বিভিন্ন ব্যাংকের নামে বেনামে টাকা রেখেছে । সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করেছে । প্রত্যেকটি কাজের বিলের সময় আলাদা আলাদা করে গুনে গুনে পিস হিসাব করে টাকা নিয়ে বিল পাশ করত। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে হয়রানী হতে হতো। পাশাপাশি কোন সাংবাদিক যদি সত্য তুলে তার বিরুদ্ধে বাবু তার পালিত ব্যক্তিদের বাদী বানিয়ে থানায় দায়ের করে জিডি এবং মিথ্যা অভিযোগ। পাশাপাশি পুলিশ দিয়ে করায় হয়রানী।
এ বিষয়ে জামালপুর জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রধান সহকারী জাহাঙ্গীর কবীর বাবুকে একাধিক বার মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে নাম্বারটি বন্ধ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

























আপনার মতামত লিখুন :