Swadesh Chitro
  • ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
banner

ঢাকা টু যশোর: আন্তর্জাতিক স্বর্ণ পাচারকারীদের ‘সেফ করিডোর’


FavIcon
মোঃ নজরুল ইসলাম,(নিজস্ব প্রতিবেদক)যশোর:
প্রকাশিত: জুলাই ২১, ২০২৬, ০৪:২১ পিএম
ঢাকা টু যশোর: আন্তর্জাতিক স্বর্ণ পাচারকারীদের ‘সেফ করিডোর’
ঢাকা টু যশোর: আন্তর্জাতিক স্বর্ণ পাচারকারীদের ‘সেফ করিডোর’`

সীমান্তে বারবার ধরা পড়ছে শুধু ‘বাহক’ বা চুনোপুঁটিরা। অথচ কোটি কোটি টাকার আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের মূল অর্থদাতা ও গডফাদাররা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। সম্প্রতি যশোর সীমান্তে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ জব্দের ঘটনায় তদন্তে নেমে এমনই একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাজধানী ঢাকাকে স্বর্ণের ‘কালেকশন হাব’ হিসেবে ব্যবহার করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের সীমান্তগুলোকে ভারতে স্বর্ণ পাচারের নিরাপদ করিডোর হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র। গত ৭ মে যশোর-নড়াইল মহাসড়কের নীলগঞ্জ ব্রিজ এলাকায় একটি প্রাইভেটকারে (ঢাকা মেট্রো গ-২২-৭৯৩০) তল্লাশি চালায় বিজিবির যশোর ব্যাটালিয়নের একটি দল।

বাইরে থেকে সাধারণ গাড়ি মনে হলেও চালক ও যাত্রীদের আসনের ভেতরে বিশেষভাবে তৈরি গোপন চেম্বার থেকে উদ্ধার করা হয় ২৬টি নিখাদ স্বর্ণের বার, যার মোট ওজন ৩ কেজি ৪৮ গ্রাম।গাড়ি, মোবাইল ফোন এবং জব্দ করা স্বর্ণসহ পুরো চালানের আনুমানিক সিজার মূল্য ছিল ৬ কোটি ৫৮ লাখ ৭০ হাজার ৮৬৭ টাকা।

এ ঘটনায় রনি (৩৬), আব্দুল গনি (৫৪) ও ইসরাইল (৪৬) নামে তিনজনকে আটক করা হয়। বিজিবির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানান, স্বর্ণের মূল মালিক বা গডফাদাররা ঢাকার উত্তরা ও আব্দুল্লাহপুর এলাকায় অবস্থান করছেন। সেখান থেকেই স্বর্ণ সংগ্রহ করে যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছিল।সোমবার (২০ জুলাই) যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মো. মিরাজুল ইসলাম বাংলাপোস্টকে বলেন, স্বর্ণ উদ্ধারের পর মামলার প্রাথমিক তদন্ত শেষে তা সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

মূল হোতা ও অর্থদাতাদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার দায়িত্বে থাকে সিআইডি। অন্যদিকে সীমান্তে চোরাচালান ঠেকাতে পুলিশ ও বিজিবি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। চোরাকারবারিরা নতুন কোনো প্রযুক্তি বা কৌশল ব্যবহার করছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত তারা মূলত বার আকারে স্বর্ণ বিশেষভাবে লুকিয়ে পাচারের চেষ্টাই করছে।

যশোর কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি (তদন্ত) কাজী বাদল হোসেন বাংলাপোস্টকে জানান, আটক তিন আসামি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে চক্রটির বিষয়ে এই মুহূর্তে বিস্তারিত কিছু জানানো সম্ভব নয়।

যশোর সদর থানার ওসি মো. মাসুম খান বাংলাপোস্টকে জানান, সদর এলাকায় প্রশাসনের কড়া নজরদারির কারণে পাচারকারীরা এখন সরাসরি ওই পথে না গিয়ে নড়াইলসহ পার্শ্ববর্তী জেলার বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে সীমান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।বিজিবির অপারেশন উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমান বাংলাপোস্টকে বলেন, সীমান্তে চোরাচালান প্রতিরোধে সব ব্যাটালিয়নকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।বিজিবির জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক শরিফুল ইসলাম বাংলাপোস্টকে জানান, যশোর, সাতক্ষীরা ও খুলনা সীমান্ত দিয়ে স্বর্ণ পাচারের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।

তবে দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রায় সব সীমান্ত দিয়েই স্বর্ণ পাচারের চেষ্টা হচ্ছে এবং তা প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।শুধু যশোর নয়, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত ও বিমানবন্দরে স্বর্ণ পাচারের একাধিক বড় চালান জব্দ হয়েছে। দুবাই–চট্টগ্রাম আকাশপথ ১৩ জুলাই চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুবাইফেরত এক যাত্রীর অন্তর্বাস ও পায়জামার বেল্টের ভেতর থেকে ২ দশমিক ১৬ কেজি গলিত সোনা উদ্ধার করে এনএসআই ও ডিজিএফআই। উদ্ধার করা সোনার বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একই বিমানবন্দরে দুবাইফেরত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৭৭-ইআর উড়োজাহাজের সিটের নিচে স্বর্ণ পাচারের ঘটনায় পুরো বিমানটিই জব্দ করা হয়েছিল। চুয়াডাঙ্গা–দর্শনা সীমান্ত চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবি এপ্রিলে পরপর দুটি বড় চালান জব্দ করে। ১৩ এপ্রিল দর্শনা পুরাতন রেলস্টেশনে আলমঙ্গীর খানকে প্রায় আড়াই কোটি টাকা মূল্যের ১০টি স্বর্ণের বারসহ আটক করা হয়। এর একদিন আগে ১২ এপ্রিল বারাদি সীমান্তে সমর হালদারকে বাইসাইকেলে করে ভারতে চারটি স্বর্ণের বার পাচারের সময় হাতেনাতে আটক করা হয়। 

জয়পুরহাট–পাঁচবিবি সীমান্ত
২৮ ফেব্রুয়ারি জয়পুরহাটের পূর্ব উচনা সীমান্তে একটি পুরোনো বাইসাইকেলের সিটের ভেতরের ফাঁপা লোহার রডে অভিনব কৌশলে লুকানো ৫০ ভরি সোনা উদ্ধার করে ২০ বিজিবি ব্যাটালিয়ন। যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা।এ ছাড়া ৩ জুলাই হাটখোলা সীমান্তে মামুনুর রশিদ নামে এক যুবককে ১০টি স্বর্ণের বারসহ আটক করা হয়।

এখন নজর সিআইডির তদন্তে
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্তে কঠোর নজরদারির ফলে বাহকরা নিয়মিত ধরা পড়ছে। কিন্তু রাজধানী কিংবা বিদেশে বসে যারা কোটি কোটি টাকার এই চোরাচালান নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে, তাদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা না গেলে স্বর্ণ পাচার পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হবে।এ কারণেই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের তদন্ত। তাদের দায়িত্ব শুধু আটক ব্যক্তিদের নয়, বরং অর্থদাতা, গডফাদার এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের পুরো শৃঙ্খল উন্মোচন করা।

এ বিষয়ে সিআইডির জনসংযোগ কর্মকর্তা পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন বলেন, স্বর্ণ চোরাচালানের বিভিন্ন মামলার তদন্ত নিয়মিত চলছে। অনেক মামলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এসেছে, আবার কিছু মামলায় প্রয়োজনীয় সূত্র না পাওয়ায় তদন্ত দীর্ঘ সময় ধরে চলতে হয়।

Banner
Side banner

সারাদেশ বিভাগের আরো খবর

Small Banner
Side banner