Swadesh Chitro
  • ঢাকা সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩
banner

ডোম-ইনো লিমিটেডে অবসায়ক নিয়োগের নির্দেশ হাইকোর্টের


FavIcon
অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশিত: আগস্ট ১৬, ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম
ডোম-ইনো লিমিটেডে অবসায়ক নিয়োগের নির্দেশ হাইকোর্টের
ডোম-ইনো লিমিটেডে অবসায়ক নিয়োগের নির্দেশ হাইকোর্টের

চুক্তির ১০-২০ বছরের মধ্যেও বহু প্লট মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়ে তাদের সঙ্গে ভয়ংকর প্রতারণার অভিযোগ থাকা ডেভেলপার কোম্পানি ‘ডোম-ইনো লিমিটেড’-এ অস্থায়ী লিকুইডেটর বা অবসায়ক নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। 

রাজধানীর শান্তিনগরে ‘ডোম-ইনো প্রমেসা’ নামক প্রকল্পে ফ্ল্যাট বুকিং দিয়ে প্রায় সমুদয় অর্থ পরিশোধ করেও নির্ধারিত সময় পার হওয়ার ১০ বছরেও ফ্ল্যাট পাননি ক্রেতারা। এ রকম ৭৩ জন ভুক্তভোগী ফ্ল্যাট ক্রেতার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ শুনানি শেষে বিচারপতি সিকদার মাহমুদুর রাজির আদালত গত ৯ আগস্ট ‘ডোম-ইনো লিমিটেড’-এ অস্থায়ী লিকুইডেটর নিয়োগের আদেশ দেন। রায়ে আদালত বলেছেন, আদালত কর্তৃক নিযুক্ত অস্থায়ী লিকুইডেটর আপাতত ‘ডোম-ইনো প্রমেসা’ প্রকল্পের সমুদয় দায়িত্বে থাকবেন। আদালত রায়ে এটিও বলেছেন, ডোম-ইনো কর্তৃক ভুক্তভোগী অন্যান্য প্লট মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতারাও আদালতের শরণাপন্ন হলে তাদের আবেদনও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

আবেদনকারীদের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. নজরুল ইসলাম খান। তার সঙ্গে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জামিল খান ও অ্যাডভোকেট মাহমুদ খলিল। গতকাল শনিবার ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে অ্যাডভোকেট মো. নজরুল ইসলাম খান জানান, শুনানিকালে তিনিসহ তার সহযোগী আইনজীবীরা দৈনিক ইত্তেফাকে সম্প্রতি প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনেন। প্রতিবেদন দুটি আদালতে পাঠ করে শুনানো হয়। এছাড়া, ইংরেজি দৈনিক ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’, দৈনিক ‘কালবেলা’ ও অনলাইন নিউজপোর্টাল ‘জাগো নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনও আদালতের নজরে আনা হয়। আদালত প্রতিবেদনগুলো বিবেচনায় নেন।

গত ৩ জুন ‘ডোম-ইনোর ফাঁদে বন্দি হাজারো পরিবারের স্বপ্ন’ এবং গত ২ আগস্ট ‘ডোম-ইনোর ভয়ংকর প্রতারণা :কেউ নিঃস্ব, কারো কারো মৃত্যু’ শিরোনামে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় দৈনিক ইত্তেফাকে। প্রতিবেদন দুটি আদালতের নজরে এনে তা পাঠ করে শোনান অ্যাডভোকেট মো. নজরুল ইসলাম খান। এ সময় তিনি বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও ইংল্যান্ডের বিভিন্ন আদালতের এ সংক্রান্ত মামলার রেফারেন্স বা উদাহরণও তুলে ধরেন।

অস্থায়ী লিকুইডেটর বা অবসায়কের কার্যক্রম ও কাজের পরিধি সম্পর্কে কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মো. নজরুল ইসলাম খান বলেন, আদালত কর্তৃক নিযুক্ত এ ধরনের কর্মকর্তাকে ‘বিলুপ্তিকরণ কর্মকর্তা’ কিংবা ‘ঋণ ও সম্পদ নিষ্পত্তিকারক’ও বলা হয়ে থাকে। আইনি ও ব্যবসায়িক পরিভাষায় লিকুইডেটর হলেন এমন একজন ব্যক্তি, যাকে দেউলিয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো কোম্পানির সম্পত্তি বিক্রি করে তার ঋণ ও পাওনা পরিশোধ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

লিকুইডেটরের দায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি বন্ধ হতে যাওয়া কোম্পানির সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। কোম্পানির সম্পদ বা মালামাল বিক্রি করে নগদ অর্থে রূপান্তর করা এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে নিয়মানুয়ায়ী পাওনাদার ও ব্যাংকগুলোর ঋণ পরিশোধের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। এছাড়া, সব দেনা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত অর্থ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করেন লিকুইডেটর।

এক প্রশ্নের জবাবে এই আইনজীবী জানান, ‘ডোম-ইনো লিমিটেড’-এ অস্থায়ী লিকুইডেটর বা অবসায়ক নিয়োগের যেই আদেশ দিয়েছেন আদালত, খুব শিগগিরই সেটির সার্টিফাইড কপি পাওয়া যাবে। এর পরপরই অবসায়ক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে। অবসায়ক দায়িত্ব নেওয়ার পর প্লট মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতারা যার যার ফ্ল্যাটের নিবন্ধন নিতে পারবেন। অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম খান বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের রায় একটি মাইলফলক। এই রায়ের ফলে এখন থেকে আবাসন কোম্পানি কিংবা ডেভেলপাররা গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করার সাহস পাবে না। প্রতারণা করলে কী পরিণতি হতে পারে—এই রায় সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।

উচ্চ আদালতে এই আবেদনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম খান জানান, ডোম-ইনোর বিভিন্ন প্রকল্পে ফ্ল্যাট বুকিং দেওয়ার পর প্রায় সমুদয় অর্থ পরিশোধ করেও নির্ধারিত সময় পার হওয়ার ১০-১৫ বছর পরেও অনেকে ফ্ল্যাট না পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে তার কাছে আসেন। চুক্তি অনুযায়ী তিন বছরের মধ্যে কোম্পানি ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে কোথাও শুধু স্ট্রাকচার নির্মাণ করে রাখা হয়েছে, কোথাও ভবন নির্মাণের কাজই শুরু করা হয়নি। এভাবে ১০-২০ বছর ধরে এসব স্থাপনা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর গত বছরের মাঝামাঝি কোম্পানি আইনের ২৪২ ধারায় প্রথমে তিনি ডোম-ইনোকে আইনি নোটিশ দেন। এখানে সুনির্দিষ্ট অর্থের উল্লেখ ছিল, অর্থ গ্রহণের স্বীকৃতি ও রসিদও ছিল। অর্থাৎ অর্থ দেওয়া নিয়ে কোম্পানি ও গ্রাহকের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। কিন্তু, ডোম-ইনো নোটিশের জবাব দেয়নি।

পরবর্তী সময় গত বছরের নভেম্বরে হাইকোর্টের বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরীর আদালতে ভুক্তভোগী ছয় জন ফ্ল্যাট ক্রেতা বাদী হয়ে আবেদন করেন। আদালত মামলাটি গ্রহণ করেন। ডোম-ইনোর এই প্রকল্পটি রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের সেনপাড়ায়, প্রকল্পের নাম ‘ডোম-ইনো প্রোভিস্তা’। কিন্তু, ঐ আদালতে মামলাটির শুনানি হয়নি। পরে আরও ১০০ জন ভুক্তভোগী আবেদনের পক্ষভুক্ত হন। ফ্ল্যাট ক্রেতারা কোম্পানিকে টাকা দেওয়া শুরু করেন ২০১২ সালে। চুক্তি মোতাবেক ভবন নির্মাণ শেষে ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়ার কথা ছিল ২০১৫ সালে। তবে, এখন পর্যন্ত ভবন নির্মাণ হয়নি শুধু স্ট্রাকচার হয়েছে।

এর মধ্যে ‘ডোম-ইনো পরিবারের পক্ষ থেকে’ ফ্ল্যাট ক্রেতাদের লিখিতভাবে অঙ্গীকারনানা দিয়ে বলা হয় যে, কোম্পানির পক্ষে এই দায়দায়িত্ব বহনের আর সক্ষমতা নেই। জমির মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতারা নিজেরা যেন দায়িত্ব নিয়ে প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নেন অঙ্গীকারনামায় সেটি বলা হয়। এতে কথা ছিল, কোম্পানি সুপারভিশনের কাজ করবে শুধু। কিন্তু, পরে প্রতিশ্রুতি ভেঙে কোম্পানি গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিজেরাই প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এছাড়া, কোম্পানি ফ্ল্যাট ক্রেতাদের গণহারে চিঠি দিয়ে আরও টাকা দাবি করতে থাকে; ‘বিলম্ব ফি’ দেখিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রাপ্ত অর্থের কয়েক গুণ দাবি করা হয় ক্রেতাদের কাছ থেকে। যেমন, একজন ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা মূল্য নির্ধারণ করে ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছিলেন। এর মধ্যে তিনি ৮০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। এখন তাকে কোম্পানি চিঠি দিয়ে আরও ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা দাবি করেছে।

রাজধানীর শান্তিনগরে যেই ‘ডোম-ইনো প্রমেসা’ প্রকল্প অবসায়কের নিয়ন্ত্রণে যাবে বলে হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছেন, সেখানে প্লট মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতারা যেন নিজ দায়িত্বে ভবনের নির্মাণকাজ শেষ করতে না পারেন, সেজন্য ডোম-ইনো বিদ্যুৎ অফিসে লিখিত চিঠি দিয়ে স্থায়ীভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করিয়েছে। এতে সেখানে বসবাসকারী পরিবারগুলো প্রায় এক বছর ধরে বিদ্যুত্হীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই প্রকল্পে তিনটি ভবনে মোট ১৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণ হওয়ার কথা। এর মধ্যে দুটি ভবন নির্মাণ হলেও অনেক কাজ অসম্পন্ন।

‘ডোম-ইনো প্রমেসা’ প্রকল্পের ভুক্তভোগী ৭৩ জন ফ্ল্যাট ক্রেতা আবেদন করেন হাইকোর্টের বিচারপতি তৌফিক ইনামের আদালতে। আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মো. নজরুল ইসলাম খান। শুনানিতে তিনি বলেন, বর্তমান কর্তৃপক্ষের হাতে কোম্পানিটি নিরাপদ নয়। তাদের অপকর্মের কারণে বিপর্যয় আরও বাড়ছে। তিনি কোম্পানিতে অস্থায়ী লিকুইডেটর নিয়োগের আদেশ চান। কিন্তু শুনানি শেষে এই আদালত রায় দিতে বিব্রতবোধ করেন। পরে এটা প্রধান বিচারপতির কাছে গেলে তিনি আবেদনটি নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি সিকদার মাহমুদুর রাজির বেঞ্চে পাঠান। এই পর্যায়ে ডোম-ইনোর পক্ষে তার আইনজীবী আদালতকে জানান, আইনগতভাবে এই আদালতে মামলাটি চলতে পারে না, এ ধরনের মামলা আরবিট্রেশন কোর্টে হয়ে থাকে। এটা বলে তারা আবেদনটি খারিজ চান। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত ডোম-ইনোর আবেদন খারিজ করে দেন এবং ‘ডোম-ইনো লিমিটেড’-এ অস্থায়ী লিকুইডেটর বা অবসায়ক নিয়োগের নির্দেশ দেন। আইনজীবী নজরুল ইসলাম খান জানান, ডোম-ইনো বিল্ডার্স ও ডোম-ইনো কনস্ট্রাকশনের বিরুদ্ধেও উচ্চ আদালতে মামলা বিচারাধীন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডোম-ইনোর এ রকম ভয়ংকর প্রতারণার শিকার অন্তত ৮০ জন জমির মালিক ও শত শত ফ্ল্যাট ক্রেতা। ভুক্তভোগী প্লট মালিকদের সবার বাড়ি ভেঙে জমি দখলে নিয়ে ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যেও ভবন নির্মাণ করেনি ডোম-ইনো। নিজেদের বাড়ি ভেঙে জমি কোম্পানিকে বুঝিয়ে দিয়ে বছরের পর বছর ধরে থাকতে হচ্ছে ভাড়া বাসায়। শত শত ফ্ল্যাট ক্রেতা সমুদয় অর্থ কোম্পানিকে পরিশোধ করেও ফ্ল্যাট পাচ্ছেন না। সব মিলিয়ে হাজারো পরিবারের স্বপ্ন আটকে গেছে ডোম-ইনোর প্রতারণার ফাঁদে। ভবন নির্মাণের জন্য ডোম-ইনোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ অনেকে ইতিমধ্যে মারাও গেছেন।

ডোম-ইনোর মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে অন্তত ১৩৬টি মামলা রয়েছে। একটি মামলায় কিছুদিন আগে তার চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর সিনিয়র দায়রা জজ। দুটি আরবিট্রেশন মামলায় ১৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা করে জরিমানা হয়েছে তার। এই দুটি মামলায় জমির মালিকের দেওয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নিও বাতিল করেছে আরবিট্রেশন কোর্ট। শতাধিক মামলার মধ্যে অন্তত ১৭টিতে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। গত ১১ আগস্টও একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে প্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন ঢাকার এসিএমএম-২ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসাইন। এসব দণ্ড ও পরোয়ানা মাথায় নিয়ে অফিস-বাসা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন আব্দুস সালাম এবং তার স্ত্রী ও কোম্পানির চেয়ারম্যান রিজওয়ানা ইসলাম। এই দম্পতি যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

Banner
Side banner

আইন-আদালত বিভাগের আরো খবর

Small Banner
Side banner