Swadesh Chitro
  • ঢাকা সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
banner

আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ হয়ে ডুবেছে, জাতীয় পার্টি কি আর উঠতে পারবে


FavIcon
অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম
আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ হয়ে ডুবেছে, জাতীয় পার্টি কি আর উঠতে পারবে
জাতীয় পার্টির লোগো

জাতীয় পার্টি (জাপা) একসময় দেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো। বড় দুই দলের ক্ষমতার সমীকরণেও অনেক ক্ষেত্রে দলটির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘ সখ্য, বিতর্কিত নির্বাচনগুলোয় অংশগ্রহণ, নেতৃত্বসংকট ও বারবার ভাঙনের ধাক্কায় সেই অবস্থান এখন গেছে হারিয়ে। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি কোনো আসন পায়নি; এমনকি দলটির রংপুরের মতো ঘাঁটিতেও প্রভাব ভেঙে পড়েছে। ফলে জাতীয় পার্টির সামনে এখন বড় প্রশ্ন দলটি আবার রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হতে পারবে কি না?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক, জাতীয় পার্টির সাবেক ও বর্তমান নেতাদের অনেকে মনে করেন, ভোট এবং মাঠের রাজনীতিতে দলটির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। কারণ, দলটির নিজস্ব কোনো কর্মিবাহিনী নেই। সমর্থকগোষ্ঠীও বিভিন্ন দলে ভিড়ে গেছে। নতুন করে দলকে দাঁড় করানোর মতো নেতৃত্বও নেই। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে জাতীয় পার্টিকে এখন ছোট দলের কাতারেই দেখা হচ্ছে।

১৯৯১ সালে দেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রায় সব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পরের অবস্থানে ছিল জাতীয় পার্টি। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলটি সংসদে উল্লেখযোগ্য আসন পায়। পরে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে বা আওয়ামী লীগের কৃপায় জাতীয় পার্টি সংসদের প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে। কিন্তু সেই অবস্থান এবার পুরোপুরি বদলে গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০০ আসনে প্রার্থী দিয়েও দলটি কোনো আসন পায়নি; কোনো প্রার্থী মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেও আসতে পারেননি।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের দায়, সাংগঠনিক ভাঙন, নেতৃত্বসংকট ও ভোটব্যাংকের ক্ষয়—সব মিলিয়ে জাতীয় পার্টি এখন অস্তিত্বসংকটে। দলটি আবার ভোটের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হতে পারবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

জাতীয় পার্টির এই বিপর্যয় সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে রংপুরে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের আবেগ দীর্ঘদিন রংপুর অঞ্চলে দলটিকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে রংপুর-৩ আসনে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের তৃতীয় হয়েছেন। একসময় যে অঞ্চলে জাতীয় পার্টি ছিল প্রধান রাজনৈতিক শক্তি, সেখানে দলটির প্রার্থী এখন নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীও নন। এই ফলাফল দেখিয়েছে, জাতীয় পার্টির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকও আর আগের মতো অটুট নেই।

সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি গঠন করেন। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদের পতন হলেও দল হিসেবে জাতীয় পার্টি টিকে যায়। সামরিক শাসন থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের পরও দলটি ভোটের রাজনীতি ও ক্ষমতার সমীকরণে প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সেই বাস্তবতা পাল্টে গেছে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান যে দলটিকে রাজনীতি থেকে মুছে দিতে পারেনি, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান সেই দলের পতনের সাক্ষী হয়ে গেছে।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ফাইল ছবি

জাতীয় পার্টির বর্তমান বিপর্যয়ের বড় কারণ হিসেবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক সখ্যকে সামনে আনছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং দলটির বর্তমান ও সাবেক নেতাদের অনেকে। তাঁদের মতে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা দলটিকে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফেরার ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টির সমর্থন ছিল। এরপর ২০০৮ সালে মহাজোটের অংশ হওয়া এবং পরে বিতর্কিত তিন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন সমঝোতা, ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে সংসদে থাকা এবং সংগঠন শক্তিশালী করার বদলে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে জাতীয় পার্টি নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান হারিয়েছে। প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হলে জাতীয় পার্টি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।  শামীম হায়দার পাটোয়ারী, মহাসচিব, জাতীয় পার্টি

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কের দায়ের পাশাপাশি জাতীয় পার্টিকে দুর্বল করেছে দীর্ঘদিনের নেতৃত্বসংকট ও বারবার ভাঙন। এরশাদের জীবদ্দশাতেই দলটির নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন ছিল। ২০১৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর সেই সংকট আরও প্রকট হয়। রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের বিরোধ, পরে শীর্ষ নেতাদের একাংশের দলত্যাগ এবং আলাদা জাতীয় পার্টি গঠনের চেষ্টা এসব ঘটনায় দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি আরও নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক চাপও বেড়েছে

জুলাই অভ্যুত্থানের পর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কয়েক দফা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটে। একই সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু দল জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবিও তোলে। দলীয় চেয়ারম্যান জি এম কাদেরসহ দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। সাবেক সংসদ সদস্য ও নেতাদের কেউ কেউ গ্রেপ্তারও হয়েছেন। এসব ঘটনা দলটির রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল করে দেয়।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে। কিন্তু সেখানে জাতীয় পার্টির কোনো অংশই ডাক পায়নি। জুলাই সনদের আলোকে সংস্কার বাস্তবায়নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যেসব বৈঠক করে; সেখানেও জাতীয় পার্টি ছিল না। নির্বাচনের আগে গণমাধ্যমেও দলটির প্রচার আগের তুলনায় গুরুত্ব হারায়।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের দায়, সাংগঠনিক ভাঙন, নেতৃত্বসংকট ও ভোটব্যাংকের ক্ষয় সব মিলিয়ে জাতীয় পার্টি এখন অস্তিত্বসংকটে। দলটি আবার ভোটের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হতে পারবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

Banner
Side banner
Side banner