Swadesh Chitro
  • ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
banner

বেড়ার চরে দাদনের ফাঁদে গো-খামারিরা


FavIcon
অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৪, ২০২৫, ০৩:৫৪ পিএম
বেড়ার চরে দাদনের ফাঁদে গো-খামারিরা
চরপেঁচাকোলা গ্রামে এক খামারি বাড়িতেই গবাদি পশু লালন-পালন করছেন।

পাবনার বেড়া উপজেলার চরাঞ্চলে দাদন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় গোখামারিরা। বছরের পর বছর গরু পালন করে দুধ উৎপাদন করলেও ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন খামারিরা। দাদনের টাকা শোধ করতে গিয়ে কম দামে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন অসংখ্য খামারি। ফলে অনেকেই লোকসান ও ঋণের বোঝায় ব্যবসা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন।

বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া নাকালিয়া ইউনিয়নের চরপেঁচাকোলা, চরসাঁড়াশিয়া, চরনাগদাসহ যমুনা নদীবেষ্টিত বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে দুধ উৎপাদনের জন্য পরিচিত। এসব এলাকায় হাজার হাজার পরিবার গরু পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। প্রতিদিন এসব চর থেকে বিপুল পরিমাণ দুধ সংগ্রহ হয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়ে থাকে।

সরেজমিনে উপজেলার হাটুরিয়া নাকালিয়া ইউনিয়নের চরপেঁচাকোলা, চরসাঁড়াশিয়া, চরনাগদাসহ বেশ কিছু চর ঘুরে দেখা যায় প্রতিটি বাড়িতেই গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি গোখামার। ১০-১৫ বছর আগে চরে গরু পালন শুরু করে অনেক খামারিই সাফলতা মুখ দেখেন। এভাবে একসময় চরাঞ্চলের খামারিরা গরু পালনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। চরাঞ্চলের বেশির ভাগ খামারি দরিদ্র ও প্রান্তিক। গরু কেনা, গোয়ালঘর নির্মাণ, খাদ্য ও চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য তাদের বড় অঙ্কের পুঁজি নেই। এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছেন দাদন ব্যবসায়ীরা। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এসব খামারিকে দাদন ব্যবসায়ীরা তাদের কাছেই দুধ বিক্রির শর্তে গরুপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা লগ্নি করে থাকেন। ফলে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে বাজার দর থেকে অনেক কম দামে দুধ বিক্রি করতে হয় খামরিদের।

খামারিরা জানান, দুধ উৎপাদন শুরু করার আগেই অনেককে দাদন নিতে হয়। কেউ গরু কেনার জন্য, কেউ চিকিৎসা বা সংসারের খরচ মেটাতে দাদনের টাকা নেন। এই দাদনের শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট দামে দুধ দিতে হয় ব্যবসায়ীদের। বর্তমানে বাজারে প্রতি লিটার দুধের ন্যায্যমূল্য যেখানে ৭০ থেকে ৮০ টাকা, সেখানে দাদনের শর্ত অনুযায়ী অনেক খামারিকে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় দুধ দিতে হচ্ছে। বাজারদর বাড়লেও দাদনের দামে কোনো পরিবর্তন আসে না।

চরপেঁচাকোলা গ্রামের খামারি আব্দুল হালিম মাঝি বলেন, গ্রামে অন্তত দুই শতাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামার রয়েছে। এসব খামারের অর্ধেকের বেশি খামারিই দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি। প্রতিটি গরুর উৎপাদিত দুধ তাদের কাছে ৪৫ টাকা লিটার দরে আগাম বিক্রি দেওয়া রয়েছে। গরুপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা দাদন নেওয়ায় সকাল-বিকাল উৎপাদিত দুধ তুলে দিতে হচ্ছে খামারিদের। অথচ আধাকিলোমিটার নদী পার দিয়ে সেই দুধ স্থানীয় বাজারে ৭০ থেকে ৮০ টাকা লিটার বিক্রি হচ্ছে। এতে লাভের বড় অংশই লুফে নিচ্ছেন এসব দাদন ব্যবসায়ী। ফলে শত শত খামারি গরু (গাভি) পালনে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

চরসাঁড়াশিয়া গ্রামের আমোদ আলী শেখ বলেন, দাদন ব্যবসায়ীরা হিসাবের খাতায় নানা অজুহাতে টাকা কেটে নেন। কখনো দুধের মান খারাপ, কখনো ওজনে কম এভাবে খামারিদের প্রাপ্য আরো কমে যায়। বাজারে সব ধরনের গোখাদ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় দুধ উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে। এছাড়া ৪৫ থেকে ৫০ টাকা দরে চুক্তিতে দুধ দিতে না পেরে অনেক খামারি দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। আবার অনেক খামার বন্ধ করে গরু (গাভি) বিক্রি করে দাদনের টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ বিষয়ে কয়েক জন দাদন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা খামারিদের আগাম টাকা দেন বলেই ঝুঁকি থাকে। দুধের দাম কম হলেও পরিবহন ও সংরক্ষণ খরচ বেশি।

পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলে গরু পালনে খামারিদের খরচ তুলনামূলকভাবে কম। তারা বছরের অর্ধেক সময় ধরে চরের কাঁচা ঘাস সংগ্রহ করে গোখাদ্যের চাহিদা পূরণ করে থাকেন। বেড়া উপজেলার বিভিন্ন চরে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে ঋণ সহায়তার কোনো সুযোগ নেই।

Banner
Side banner
Side banner